
অনলাইন ডেস্কঃ
রংপুরে আলুর বাজারে ধস দেখা দিয়েছে। সরকারিভাবে আলুর দর কেজিপ্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ করা হলেও হিমাগারের খরচ বাদ দিয়ে কৃষকের হাতে আসছে মাত্র পাঁচ টাকা। এতে লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় প্রায় ৬৬ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে।
এতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২০ লাখ টন। তবে এই বিপুল উৎপাদনের তুলনায় সংরক্ষণের ব্যবস্থা খুবই সীমিত। জেলায় রয়েছে মাত্র ৪০টি হিমাগার, যার মোট ধারণক্ষমতা প্রায় চার লাখ ৬০ হাজার টন। অর্থাৎ উৎপাদনের চার ভাগের এক ভাগেরও কম আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে।
সূত্র জানায়, রংপুর-সদর উপজেলা, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ, গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ এলাকায় আলুর ব্যাপক ফলন হয়েছে। এর মধ্যে গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তার চর এলাকাগুলো আলুর ফলন হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৪০টি হিমাগারে বর্তমানে চার লাখ ৬১ হাজার ৭৪৭ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত বের করা হয়েছে মাত্র এক লাখ এক হাজার ৫৯৪ টন, যা মোট মজুদের চার ভাগের এক ভাগেরও কম।
বাজারে চাহিদা কম থাকায় হিমাগার থেকে আলু তোলার প্রবণতাও কম। এদিকে, আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে নতুন মৌসুমের আলু চাষ শুরু হওয়ার কথা। মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে সেই আলু বাজারে চলে আসবে। ফলে বর্তমানে হিমাগারে থাকা বিপুল পরিমাণ আলু বিক্রি না হলে তা থেকেই পচে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চাষিদের হিসাব অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে আলু উৎপাদনের খরচ কেজিপ্রতি ১৮ থেকে ২০ টাকা। বস্তা, পরিবহন ও অন্যান্য খরচসহ হিমাগারে সংরক্ষণ করলে মোট খরচ দাঁড়ায় ৩০ টাকারও বেশি। অথচ বর্তমানে বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে প্রকার ভেদে মাত্র সাত থেকে আট টাকা কেজি দরে। হিমাগারের ভাড়া ও অন্যান্য খরচ বাদ দিলে কৃষকের হাতে থাকছে মাত্র পাঁচ টাকা। এতে সরকার নির্ধারিত দাম ও বাস্তব বাজারদরের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
রংপুর বিভাগের আট জেলায় এবার আলু চাষ হয়েছে প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে। মোট উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার ৯৯২ টন। তবে বিভাগের ১১৬টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৯ হাজার ৬৯২ টন। ফলে বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণ সংকট ও বাজারদরের পতনের কারণে কৃষকেরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, শুধু হিমাগারে সংরক্ষিত আলুতেই এবার প্রায় এক হাজার ৯৯৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকার লোকসান হয়েছে।
রংপুরে বিভিন্ন হিমাগার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে আলু প্রকার ভেদে সাত থেকে আট টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে ক্রেতা কম থাকায় হিমাগারগুলোতে তেমন কর্মচাঞ্চল্য নেই। অধিকাংশ শেডই প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে।
রংপুরে আলু ব্যবসায়ী গফ্ফার আলী জানান, তিনি প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যয়ে চার একর জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। এতে তার উৎপাদন খরচ পড়েছে কেজিপ্রতি প্রায় ২০ টাকা। মৌসুমের শুরুতে বাজারদর কিছুটা বেশি থাকায় তিনি ৭০০ বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। প্রতিবস্তায় ৬০ কেজি করে আলু রয়েছে।
গফ্ফার আলী আরো বলেন, ‘গত মাসে বাধ্য হয়ে ১২ টাকা দরে ৩০০ বস্তা আলু বিক্রি করেছি। কিন্তু হিমাগারের ভাড়া কেজিপ্রতি ছয় টাকা ৭৫ পয়সা কেটে নেওয়ার পর আমার হাতে এসেছে মাত্র পাঁচ টাকা ২৫ পয়সা। এতে বড় ধরনের লোকসান হয়েছে।’
একই অবস্থা রংপুরে এনএন হিমাগারের। সেখানে প্রায় দুই লাখ ৬০ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বের হয়েছে মাত্র ৪৫ হাজার বস্তা।
তারাগঞ্জ উপজেলার কৃষক বাদল মিয়া বলেন, ‘এক কেজি আলু উৎপাদন করতে আমাদের খরচ পড়ে প্রায় ২০ টাকা। বস্তা, গাড়িভাড়া ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ৩০ টাকা হয়ে যায়। অথচ বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে সাত থেকে আট টাকা দরে। হিমাগারের খরচ কেটে দিলে হাতে থাকে মাত্র পাঁচ টাকা। তাহলে সরকার কোথায় ২২ টাকায় আলু কিনছে?’
বাদল মিয়া আরো বলেন, এই লোকসান দিয়ে আমরা কীভাবে টিকে থাকব? এমন অবস্থা চলতে থাকলে অনেক কৃষক আগামী মৌসুমে আলু চাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।’
এ ব্যাপারে রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, সরকারিভাবে যদি রংপুর অঞ্চলে আলু কেনা হয় তাহলে কৃষকেরা কিছুটা উপকৃত হবেন। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাইনি। আমরা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরিকল্পিতভাবে আলু চাষ করার বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছি। তিনি বলেন, রংপুর বিভাগের আট জেলায় এবার আলু চাষ হয়েছে প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে। এতে মোট উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার ৯৯২ টন আলু।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন বেশি হওয়া, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রতিবছরই আলুর বাজারে অস্থিরতা দেখা যায়। সময়মতো সরকারিভাবে আলু সংগ্রহ ও রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো না হলে আগামী মৌসুমে আলু চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন কৃষকেরা।
সুত্রঃ কালের কন্ঠ
এমকন্ঠ/এস