অভিযানেও থামছে না মাদক, গত সাত মাসেই প্রায় ৩৯ হাজার মামলা

স্টাফ রিপোর্টার:
দেশে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও গ্রেফতার সত্ত্বেও থামছে না মাদকসংক্রান্ত অপরাধ। বরং প্রতিদিনই বাড়ছে মাদক মামলা। গত আড়াই বছরে দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় লাখে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি বছর ৫০ হাজারেরও বেশি মামলা হয়েছে। চলতি বছরও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। বছরের প্রথম সাত মাসেই মাদকসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৩৯ হাজার।

পুলিশের ভাষ্য, মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং এসব অভিযানে নিয়মিত মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তবে গ্রেফতারের পর জামিনে বেরিয়ে এসে অনেকেই ফের মাদক কারবার বা সেবনে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে চিহ্নিত ও বারবার গ্রেফতার হওয়া মাদক কারবারিদের একটি অংশ জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় মাদক নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। ফলে একদিকে অভিযান ও গ্রেফতার অব্যাহত থাকলেও অন্যদিকে একই ব্যক্তিদের পুনঃপুন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণে মাদকের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য বলছে, গেল আড়াই বছরে মাদক মামলা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৩৬টি। ২০২৪ সালের ১২ মাসে ৫২ হাজার ১৭টি মামলা হয়েছে। পরের বছর ২০২৫ সালে ১২ মাসে মামলা হয়েছে ৫০ হাজার ৮০৫টি। আর চলতি বছর গত সাত মাসে ৩৯ হাজার ১১৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৪ হাজার ৯২২টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩ হাজার ৩৬৯টি, মার্চে ৫ হাজার ৬২টি, এপ্রিলে ৫ হাজার ৭০৬টি, মে-তে ৭ হাজার ৯২টি, জুনে ৬ হাজার ৫৮০টি এবং জুলাই মাসে ৬ হাজার ৩৮৩টি।

২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই মাদকসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৩৯ হাজার। গত সাত মাসের পৃথক হিসেবে, সবচেয়ে বেশি মাদক মামলা জানুয়ারিতে ঢাকা রেঞ্জে ১ হাজার ৯৭টি, দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম ৮১৭টি, তৃতীয় ঢাকা মহানগর ৫৬৪টি এবং তৃতীয় বরিশাল ৩১টি। তবে চার রেঞ্জ ও ঢাকা মহানগর মিলে মামলার সংখ্যা ৩ হাজার ৩৮৪টি। যা মোট মামলার ৬৮ শতাংশ। রেঞ্জগুলো হলো-ঢাকা, চট্টগ্রাম, ডিএমপি, খুলনা ও রাজশাহী।

২০২৬ সালের মে ও জুন মাসের মামলা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মে মাসে ঢাকা রেঞ্জে মামলার সংখ্যা ১ হাজার ৫৫৫টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১ হাজার ১২৮টি, রংপুর রেঞ্জে ৭৪৭টি, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মিলে ২ হাজার ৬৮৩টি। আর শীর্ষ পাঁচ রেঞ্জ মিলে মামলার সংখ্যা ৪ হাজার ৭৬৬টি। গত জুন মাসে ঢাকা রেঞ্জে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৫৯০টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৯৮৪টি, খুলনা রেঞ্জে ৬৬১, রাজশাহী রেঞ্জে ৬০৬টি এবং রংপুর রেঞ্জে ৬০০টি। অর্থাৎ রংপুর রেঞ্জেসেবচেয়ে কম ৬০০টি মামলা হয়েছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীপথ ও নৌবন্দরসংলগ্ন এলাকাগুলোতে মাদক পাচারের ঝুঁকি বেশি থাকে। মহাসড়কগুলোর বিভিন্ন ক্রসিং, বাসস্ট্যান্ড ও টোলপ্লাজা এলাকা মাদকের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়। এছাড়াও ঢাকা সংলগ্ন জেলাগুলোর রেলওয়ে স্টেশন ও এর আশপাশের অবহেলিত কলোনি বা চত্বর মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আগের তুলনায় মাদকবিরোধী কার্যক্রমে পুলিশের সক্রিয়তা বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখন আগের চেয়ে বেশি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং এসব অভিযানে মাদকসেবী, বিক্রেতা ও সরবরাহকারীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তবে গ্রেফতারের পর আসামিদের একটি বড় অংশ জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বিশেষ করে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের কেউ কেউ বারবার গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের এআইজি সাহাদাত হোসেন বলেন, মাদক নির্মূলে বাংলাদেশ পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছে। মাদক সরবরাহকারী ও কারবারিদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি নিয়মিত ও টার্গেটেড অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব অভিযানে মাদক উদ্ধার এবং এর সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

মাদক মামলার জট কমাতে ২২ ট্রাইব্যুনাল:
কমপক্ষে পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তির অপরাধযোগ্য মাদকের মামলার বিচারে ২২টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে সরকার। সম্প্রতি আইন ও বিচার বিভাগ থেকে মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ক্ষমতাবলে এসব ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সেগুলোর স্থানীয় অধিক্ষেত্রও নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এই প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীন কমপক্ষে পাঁচ বছর বা এর চেয়ে বেশি শাস্তিযোগ্য অপরাধের চলমান মামলাগুলো বর্তমান আদালত থেকে নবগঠিত মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি মোতাবেক স্থানান্তরিত হবে। কোনো মামলা যে পর্যায়ে স্থানান্তরিত হবে, সেই পর্যায় থেকে উক্ত মামলার বিচার পরিচালিত হবে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *