
অনলাইন ডেস্ক:
বিদায়ী ২০২৫ সালে দেশে ঘটে গেছে নানা ঘটনা। সেসব ঘটনায় নাড়া দিয়েছিল সারাদেশের মানুষের মনে। কিছু ঘটনা উজ্জীবিত করেছে, কিছু ঘটনা কাঁদিয়েছে গোটা দেশের মানুষকে। আবার কিছু ঘটনা নিয়ে এখনও চলছে নানা আলোচনা- সমালোচনা। ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলাতেও বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে, দেশ-কাঁপানো এমন দশটি ঘটনা________
১. রাজশাহীতে নলকূপের পরিত্যক্ত গর্তে শিশু!
সেদিন ছিল ১০ ডিসেম্বর। রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোয়েলহাট গ্রামে জমিতে আটকে যাওয়া ট্রলি দেখতে মা ও বাবার সঙ্গে যায় দুবছরের শিশু সাজিদ। এ সময় হঠাৎ পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের গর্তে মধ্যে পড়ে যায় সে। পেছন থেকে ‘মা, মা’ চিৎকার শুনে মা ফিরে দেখেন সাজিদ নেই। জমির খড় সরাতেই বেরিয়ে আসে মৃত্যুকূপ। এ ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
পরে শিশু সাজিদকে উদ্ধারে প্রায় ৬০ ফুট গভীর পর্যন্ত খনন করা হয়। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ফায়ার সার্ভিসের ৮টি ইউনিটের দীর্ঘ ৩২ ঘণ্টা টানা চেষ্টায় উদ্ধার করা হয় শিশু সাজিদকে। তবে অচেতন অবস্থায় উদ্ধারের পর তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সাজিদকে মৃত ঘোষণা করেন।
২. নরসিংদীতে ভূমিকম্প:
বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে নরসিংদী জেলায় অনুভূত হওয়া ভূমিকম্পে। জেলাটিতে গত ২১ নভেম্বর সকালে ও পরদিন আরও দুই দফা ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর মধ্যে প্রথম দফার জেলার মাধবদীতে উৎপত্তি হওয়া ওই ভূমিকম্পে রাজধানীসহ সারাদেশে ১১ জনের প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া আহত হন শতাধিক মানুষ। এর পরেও দেশে বেশ কয়েকটি স্বল্প মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। তবে এসব ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
৩. খাগড়াছড়িতে স্কুলছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন, গুলিতে তিনজন নিহত:
২৩ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে পাহাড়ি ছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে ব্যাপক সংঘাত ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। জুম্ম ছাত্র-জনতার সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ একপর্যায়ে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১৪৪ ধারা জারি করা হলেও ২৮ সেপ্টেম্বর গুইমারার রামেসু বাজারে ভয়াবহ অগ্নিসংযোগে অর্ধশতাধিক দোকান ও বাড়িঘর ভস্মীভূত হয়। এই সহিংসতায় গুলিতে তিনজন মারমা যুবক নিহত হন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ১৫ সদস্যসহ বহু মানুষ আহত হন। এদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ‘ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি’ বলে ব্রিফিং দেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ে। তখন পরিস্থিতি শান্ত হলেও তীব্র অসন্তোষ ও জনমনে আতঙ্কের ক্ষত রয়ে গেছে এখনো।
৪. সিলেটে সাদাপাথর কাণ্ড:
দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র সিলেটের সাদাপাথর। তবে পাথর লুটের কারণে গত আগস্ট মাসে তা পরিণত হয় মরুভূমিতে। ১১ আগস্ট একটি সংবাদ মাধ্যমের খবরে এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে আসলে দেশজুড়ে শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। এতে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। ১৫০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা এবং জেলা প্রশাসন, দুদক ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ তদন্তে নামে।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে যে, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতাকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও বিজিবির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় এই লুটপাট চলেছে। এর প্রেক্ষিতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অপসারণ করা হয়। পরবর্তীতে নতুন জেলা প্রশাসক মো. সারোয়ার আলমের কঠোর আল্টিমেটামের মুখে লুণ্ঠনকারীরা ট্রাকযোগে পাথর ফেরত দিতে শুরু করেন। বর্তমানে সাদাপাথরের সৌন্দর্য পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া চলমান।
৫. নোয়াখালীতে একসঙ্গে পরিবারের ৭ সদস্যকে হারালেন প্রবাসী:
গত ৬ আগস্ট নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। লক্ষ্মীপুর জেলার চৌপল্লি গ্রামের বাসিন্দা ওমান প্রবাসী বাহার উদ্দিন দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফিরছিলেন। পরিবারের লোকজন নিয়ে বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি বেগমগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রগঞ্জ পূর্ববাজারের জগদিশপুর এলাকার একটি খালে পড়ে ডুবে যায়। এতে প্রবাসী বাহারের নানি, মা, স্ত্রী, দুবছরের মেয়ে, ভাবি এবং দুই ভাতিজি নিহত হন। এ ঘটনা লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালীসহ সারা দেশের মানুষের মনে দাগ কাটে।
৬. গোপালগঞ্জে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’য় আওয়ামী লীগের হামলা:
গত বছর ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তদন্ত কমিশনের মতে, কর্মসূচির নাম পরিবর্তন, বঙ্গবন্ধুর সমাধি ভাঙার গুজব এবং ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ’ স্লোগান স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগকে উত্তেজিত করে তোলে। এর ফলে তারা এনসিপির সমাবেশস্থল, প্রশাসনের গাড়ি ও সরকারি বাসভবন এমনকি কারাগারেও ব্যাপক হামলা ও ভাঙচুর চালায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত এবং অর্ধশতাধিক আহত হন। পরে অবরুদ্ধ এনসিপি নেতাদের সেনা পাহারায় উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরদিন ১৭ জুলাই গোপালগঞ্জে কারফিউ জারি করা হয়।
৭. শিরকের অভিযোগ তুলে কাটা হয় ‘২০০ বছরের’ বটগাছ:
গেল বছরের ৫ মে মাদারীপুরে ‘বিদাত’ আখ্যায়িত করে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো একটি বটগাছ কেটে ফেলে স্থানীয় আলেমরা। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সমালোচনার মুখে বিশাল গাছটি সম্পূর্ণ কেটে ফেলার আগেই স্থানীয় প্রশাসন তা বন্ধ করে দেয়। প্রাচীন এই বটগাছের গোড়ায় অনেকে মোমবাতি জ্বালিয়ে মানত করতেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ‘মুসল্লি’ পরিচয়ধারী একদল ব্যক্তি গাছটির প্রায় ৭৫ শতাংশ কেটে ফেলে। তবে গাছটি কাটার কারণ শুধু ধর্মীয় বলতে রাজি নন স্থানীয়রা। তাদের দাবি গাছটি বিক্রি করতে এর মালিককে বাধ্য করার জন্য ধর্মীয় ইস্যু সামনে এনে পুরো ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে।
৮. দেশের ভূখণ্ডে আরকান আর্মি:
গত বছর এপ্রিল মাসের ১৬-১৭ তারিখে বান্দরবানের থানচি উপজেলার রেমাক্রিতে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজনে আরাকান আর্মির উপস্থিতির একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, আরাকান আর্মির ইউনিফর্মধারী ও অস্ত্রধারী শতাধিক সদস্য প্রকাশ্যে অংশ নেন। পরে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী কীভাবে বাংলাদেশে উপস্থিত হলো সে প্রশ্ন ওঠে।
ওই সময় পাহাড়ি নেতা খামলাই ম্রো জানিয়েছিলেন, এ ধরনের অনুষ্ঠান সেখানে আগেও হয়েছে, তবে এবার স্যাটেলাইটে লাইভ করার ফলে বিষয়টি সবার সামনে চলে আসে। তবে সরকারের তরফ থেকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছিলেন, এদেশে আরাকান আর্মির সদস্যরা আত্মীয়তার বন্ধনেও জড়িত। তবে ওই ঘটনার পর তাদের উপস্থিতি নেই বলে সরকারের তরফে দাবি করা হয়।
৯. মাগুরার আলোচিত ৮ বছরের শিশু ধর্ষণ-হত্যা:
গত বছরের মার্চ মাসের শুরুতে মাগুরার নিজনান্দুয়ালী গ্রামে বোনের শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয় আট বছরের এক শিশু। ৬ মার্চ শিশুটিকে অচেতন অবস্থায় মাগুরা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার বোনের শাশুড়ি। পরবর্তীতে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল এবং সিএমএইচে মোট আটদিন অচেতন অবস্থায় থাকার পর ১৩ মার্চ শিশুটির মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মাগুরা ও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ হয়।
শিশুটির মা বাদী হয়ে মামলা করলে ১৩ এপ্রিল মাগুরার মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। ১৭ মে রায়ে প্রধান আসামি শিশুটির বোনের শ্বশুর হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড এবং মামলার বাকি তিন আসামি শিশুটির বোনের জামাতা সজীব শেখ, সজীবের ভাই রাতুল শেখ ও তাদের মা জাহেদা বেগম খালাস প্রদান করেন আদালত।
১০. ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে শ্রমিককে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা:
বছরের শেষের দিকে ময়মনসিংহের ভালুকায় এক বীভৎস ঘটনা ঘটে। গত ১৮ ডিসেম্বর দিপু চন্দ্র দাস নামে এক পোশাক শ্রমিককে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে দলবদ্ধ হয়ে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়।
তবে এ ঘটনায় ‘ধর্ম অবমাননার’ কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিহতের ভাই অজ্ঞাতপরিচয় ১৫০ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করলে আটজনকে আটক করা হয়।
এমকন্ঠ/এস
Leave a Reply