ইসলামিক ডেস্ক:
বাংলার ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়ে এক অনন্য স্থাপত্যের নাম, ছোট সোনা মসজিদ। প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড় নগরীর উপকণ্ঠে, বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জে এই মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি সুলতানি আমলের শিল্প ও স্থাপত্যের এক অমূল্য নিদর্শন।
বাংলার সুলতানি শাসনের স্বর্ণযুগে, সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ-এর আমলে ওয়ালি মোহাম্মদ আলি এই মসজিদ নির্মাণ করেন।
মসজিদের মাঝের প্রবেশদ্বারের উপরে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে নির্মাতার নাম জানা গেলেও, সময়ের ক্ষয়ে নির্মাণের সুনির্দিষ্ট সাল আজ আর স্পষ্ট নয়।
স্থানীয়দের কাছে এটি “সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন” হিসেবে পরিচিত। ধারণা করা হয়, একসময় মসজিদের বাইরের অংশে সোনালি রঙের প্রলেপ ছিল। সূর্যের আলো পড়লে সেটি সোনার মতো ঝলমল করত,সেখান থেকেই এর নাম হয় “সোনা মসজিদ”। বড় সোনা মসজিদ” থেকে তুলনামূলক আকারে ছোট হওয়ায় এই মসজিদটি পরিচিতি পায় “ছোট সোনা মসজিদ” নামে।
মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ৮২ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৫২ দশমিক ৫ ফুট বিস্তৃত। উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট এবং দেয়ালগুলো প্রায় ৬ ফুট পুরু। মূল কাঠামো ইটের হলেও ভেতর ও বাইরের অংশ পাথর দিয়ে আবৃত, যা হোসেন-শাহী স্থাপত্যরীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
মোট ১৫টি গম্বুজে আচ্ছাদিত এই স্থাপনা, মাঝখানের গম্বুজগুলো বাংলা চৌচালা ধাঁচের, যা বাংলার নিজস্ব স্থাপত্য ঐতিহ্যের প্রতিফলন। বাইরের যে কোনো পাশ থেকে তাকালে মাত্র পাঁচটি গম্বুজ দেখা যায়, পেছনের গম্বুজগুলো দৃষ্টির আড়ালে থাকে। এটিই এই মসজিদের অন্যতম স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য।
পাথর খোদাইয়ের সূক্ষ্ম নকশা ছোট সোনা মসজিদের প্রধান আকর্ষণ। লতাপাতা, গোলাপ ফুল, ঝুলন্ত শিকল ও ঘণ্টার নকশা, সবই পাথরের উপর অত্যন্ত মিহি কারুকাজে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। খিলান, ফ্যাসাদ ও বুরুজ, সবখানেই রয়েছে শিল্পের ছোঁয়া।
মসজিদের উত্তর দিকে রয়েছে একটি প্রাচীন দিঘি। দক্ষিণ-পূর্ব কোণে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা,ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর এবং মেজর নাজমুল হক টুলু।
সময়ের আবর্তে রাজত্ব বদলেছে, মানচিত্র পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু গৌড়ের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট সোনা মসজিদ আজও সাক্ষ্য দেয়, বাংলার ইতিহাস শুধু ইট-পাথরের নয়, এটি শিল্প ও সভ্যতার এক অমর প্রতীক।