আজ রামিসা হত্যার রায়, নিরাপত্তা জোরদার

অনলাইন ডেস্ক:
রাজধানীর মিরপুরে পল্লবীতে শিশু রামিসাকে (৮) ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আজ রবিবার (৭ জুন) রায় ঘোষণা করবেন ট্রাইব্যুনাল। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে আসামিদের উপস্থিতিতে যুক্তিতর্ক শেষে এ দিন ধার্য করা হয়। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী পঙ্কজ পিটার গোমেজ এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, আজ নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণার জন্য প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে পুলিশি পাহারায় মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় এনে রাখা হবে। সেখান থেকে কিছুক্ষণ পরে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে ওঠানো হবে। আলোচিত এবং চাঞ্চল্যকর রায়কে কেন্দ্র করে ঢাকার নিম্ন আদালতে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য পুলিশের বিশেষ ফোর্স মোতায়েন করা হবে বলে আদালতের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় নজিরবিহীন গতিতে মামলাটি বিচারের শেষ পর্যায়ে পৌঁছাল। গত ১৯ মে দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিট অর্থাৎ ২০ মে মামলা দায়েরের পর ৫ দিনের মাথায় ২৪ মে তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। ওইদিনই ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হকের আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত বলে মত দেন এবং তা ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই দিন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন।

এরপর ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হলেও মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির স্বার্থে বিচারিকের ছুটি বাতিল করে এ মামলাটির শুনানির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১ জুন আদালত দুই আসামির উপস্থিতিতে অভিযোগ গঠন করেন। একইসঙ্গে পরেরদিন মামলার বাদীসহ ১৮ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করা হয়। ২ জুন মামলার বাদীসহ ১৬ জন সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দেন। আদালত এক দিনেই সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা শেষ করেন।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর বিচারক ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন ধার্য করেন। ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজের দায় স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। অন্যদিকে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। শুনানি শেষে বিচারক ৪ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য করেন।

৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুল রহমান দুলু এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী মূসা কালিমুল্লাহ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে বিচারক আজকের জন্য রায়ের দিন ধার্য করেন।

মামলাটিতে অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং পরবর্তীতে যুক্তিতর্ক শেষে আজ রবিবার রায়ের দিন নির্ধারণসহ সব ক্ষেত্রেই ছিল দ্রুতগতি। আদালত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় এত দ্রুত বিচারিক কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে যাওয়ার নজির দেশে খুব কমই দেখা গেছে। সাধারণত তদন্ত প্রতিবেদন, বিচার শুরু ও সাক্ষ্যগ্রহণের বিভিন্ন ধাপ পার হতে বছরের পর বছর লেগে যায়।

রায়ে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড চান রাষ্ট্র পক্ষ এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীও প্রধান আসামি সোহেল রানার যাবজ্জীবন চান। তবে আসামিপক্ষের দাবি এ মামলায় সহায়তার দায়ে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের সাত বছরের সাজা দেওয়া হোক।

রায় ঘোষণার পর সেটি কার্যকর হতে কতদিন লাগতে পারে এ প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্র পক্ষের এ মামলার বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু বলেন, সেটি একমাত্র উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত। তিনি জানান, রায়ে আমরা সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডই চাই। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রায় ঘোষণায় ট্রাইব্যুনাল দেবেন।

রায় ঘোষণার পরে তা কার্যকর হতে বিলম্ব হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। বিচারিক আদালতে রায়ের পরে একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির উচ্চ আদালতের বিভিন্ন ধাপের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারটিও থাকে। সেক্ষেত্রে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে।

তিনি আরো বলেন, প্রধান বিচারপতি চাইলে দ্রুত এই রায় কার্যকর করার জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দ্রুত শেষ করতে পারবেন। সেটি একান্তই তার এখতিয়ার।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ভুক্তভোগী রামিসা আক্তার পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে তার ফ্ল্যাটের রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকলে একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে তার জুতা দেখতে পান। ডাকাডাকির পর কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা ও অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসা আক্তারের মস্তকবিহীন মরদেহ এবং মাথা রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে দেখতে পান। আসামি স্বপ্না আক্তারকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দেখতে পেয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, তার স্বামী আসামি মো. সোহেল রানা হীন কামনা চরিতার্থ করার জন্য রামিসাকে বাথরুমের ভেতরে আটকে রেখে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে গলা কেটে হত্যা করেছে।

এ ঘটনায় শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুইজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা দায়েরের পর প্রথমে স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। একই দিন আসামি সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এমকন্ঠ/এস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *