স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ৪৮ বছর পার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠার পর দলটি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেছে, কখনো রাজপথে বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল। আবার কখনো পড়েছে অস্তিত্বের কঠিন সংকটে। প্রায় পাঁচ দশকের এই রাজনৈতিক পথচলায় বিএনপির সামনে এসেছে সামরিক শাসন, গণতন্ত্রের আন্দোলন, নির্বাচন, ক্ষমতার পালাবদল, ওয়ান-ইলেভেন এবং দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির অধ্যায়।
এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অবশ্য আলাদা। দীর্ঘ ২০ বছর রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকার পর ২০২৬ সালে আবার সরকার গঠন করেছে বিএনপি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়ী হয়। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জয়ী হন ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে। পরে তিনি বগুড়া-৬ আসন ছেড়ে দেন। ৯ এপ্রিল বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচন এবং শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচনে জয় পেয়ে দলটির আসনসংখ্যা দাঁড়ায় ২১০। এরপর ৯ জুলাই সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন চট্টগ্রাম-২ আসন থেকে বিএনপির নির্বাচিত প্রার্থী সরোয়ার আলমগীর।
ফলে ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির হিসাব শুধু অতীতের নয়। প্রশ্ন উঠছে—৪৮ বছরে দলটি কতটা সময় ক্ষমতায় ছিল, কতবার ক্ষমতায় ফিরেছে, কতবার বড় রাজনৈতিক ধাক্কা খেয়েছে এবং এবার ক্ষমতায় ফিরে আগের বিএনপির সঙ্গে কতটা বদলেছে?
শুরুতেই বড় নির্বাচনি সাফল্য
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই দলটি জাতীয় রাজনীতিতে বড় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে। নির্বাচনে দলটির এই সাফল্য ছিল প্রতিষ্ঠার পর প্রথম বড় নির্বাচনি ম্যান্ডেট। কিন্তু প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মাথায় দলের রাজনীতিতে বড় ধাক্কা আসে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে নির্মমভাবে নিহত হন জিয়াউর রহমান। এরপর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিএনপির নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে।
১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে বিএনপি চলে যায় বিরোধী রাজনীতিতে।
নয় বছরের আন্দোলন, তারপর ক্ষমতায় ফেরা
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ প্রায় নয় বছরের আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালে এরশাদের পতন হয়। এরপর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। খালেদা জিয়া হন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬—এই পাঁচ বছর বিএনপির জন্য ছিল নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সময়। রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়াও এই সময়েই ঘটে। তবে পাঁচ বছর পরই ক্ষমতা ছাড়তে হয় বিএনপিকে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলেও প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করেছিল। রাজনৈতিক চাপের মুখে খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন। নির্বাচনের পর গঠিত সংসদ ও মন্ত্রিসভার মেয়াদ ছিল মাত্র ১২ দিন। পরে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসে ক্ষমতায় থাকার ধারাবাহিকতা কখনোই সরলরেখার মতো ছিল না।
২০০১: দ্বিতীয় বড় প্রত্যাবর্তন
১৯৯৬ থেকে ২০০১—পাঁচ বছর বিরোধী দলে থাকার পর আবার নির্বাচনি বিজয় পায় বিএনপি। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। এই সরকার ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল। এই সময় বিএনপি ছিল চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে। জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপির দ্বিতীয় বড় সরকার পরিচালনার অধ্যায় শেষ হয় ২০০৬ সালে। এরপর আসে দলের ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক সংকট—ওয়ান-ইলেভেন। ওয়ান-ইলেভেনে বদলে যায় রাজনৈতিক হিসাব। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়।
দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বই গ্রেপ্তার হন। বিএনপির জন্য এটি ছিল সাংগঠনিক ও নেতৃত্বের দিক থেকে বড় ধাক্কা।
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির পরাজয়ের পর দলটি দীর্ঘ সময়ের জন্য চলে যায় বিরোধী রাজনীতিতে। এরপর শুরু হয় বিএনপির সবচেয়ে দীর্ঘ বিরোধী অধ্যায়।
যেসব কারণে খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’
২০০৯ থেকে ২০২৫: দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি: ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি প্রায় ২০ বছর রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি ও তাদের জোট বর্জন করে। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নিলেও দলটি বড় ধরনের নির্বাচনি পরাজয়ের মুখে পড়ে। ২০২৪ সালের নির্বাচনও বিএনপি বর্জন করে।
এই সময়ের বড় অংশজুড়ে বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার, ভোটাধিকার, দলীয় নেতা-কর্মীদের মামলা-গ্রেপ্তার এবং রাজপথের আন্দোলন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। এরপর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
২০০৯ থেকে ২০২৪—এই দীর্ঘ সময়ে বিএনপির রাজনীতির প্রধান অভিজ্ঞতা ছিল বিরোধী দল ও আন্দোলন পরিচালনা।
২০২৬ সালে সবচেয়ে বড় প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ ২০ বছরের রাজনীতির পর ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পায় বিএনপি। ৩৬ জন সংরক্ষিত নারী আসনসহ বর্তমান সংসদে তাদের সদস্য সংখ্যা ২৪৭ জন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি শুধু ক্ষমতায় ফেরেনি, দলটির নেতৃত্বেও এসেছে প্রজন্মগত পরিবর্তন।
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তার ছেলে তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেন। ফলে বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসে ২০২৬ একটি নতুন অধ্যায়। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল এখন তার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে।
ক্ষমতার হিসাব কী বলছে?
বিএনপির ৪৮ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসকে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার প্রধান অধ্যায়গুলোতে ভাগ করলে কয়েকটি সময় সামনে আসে—
১৯৭৯-১৯৮২: জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রথম বিএনপি সরকার।
১৯৯১-১৯৯৬: খালেদা জিয়ার প্রথম সরকার।
ফেব্রুয়ারি-মার্চ ১৯৯৬: নির্বাচনের পর গঠিত ১২ দিনের বিএনপি সরকার।
২০০১-২০০৬: খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদের সরকার।
২০২৬-বর্তমান: তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার।
এর বাইরে দীর্ঘ সময় বিএনপিকে কাটাতে হয়েছে বিরোধী দলে।
বিএনপির ইতিহাসের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—ক্ষমতায় থাকা যেমন দলটির রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ, তেমনি দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতিও দলটির সাংগঠনিক চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
চার চেয়ারম্যানের ইতিহাস
৪৮ বছরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব নেতৃত্বের। প্রতিষ্ঠার সময় জিয়াউর রহমান ছিলেন দলের চেয়ারম্যান। ১৯৮১ সালে তার মৃত্যুর পর আবদুস সাত্তার নেতৃত্বে আসেন। পরে ১৯৮৪ সালে খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন এবং চার দশকের বেশি সময় দলটির নেতৃত্বে ছিলেন।
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।
অর্থাৎ প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে খুব কমই। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ নেতৃত্ব ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ অধ্যায়।
এ কারণেই ২০২৬ সালের নেতৃত্ব পরিবর্তন বিএনপির জন্য শুধু সাংগঠনিক ঘটনা নয়; এটি দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি প্রজন্মান্তরের পরিবর্তনও।
মহাসচিব পদে বেশি পরিবর্তন
চেয়ারম্যানের তুলনায় বিএনপির মহাসচিব পদে পরিবর্তন হয়েছে অনেক বেশি। ৪৮ বছরে বিএনপির মহাসচিব পদে একাধিক নেতা দায়িত্ব পালন করেছেন; তাদের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের দায়িত্বশীলদের একজন।
তিনি ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন। ২০২৬ সালের আগস্টে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি বিএনপির মহাসচিবসহ দলীয় পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
এরপর ২০ আগস্ট ২০২৬ রুহুল কবির রিজভীকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মহাসচিব পদে নেতৃত্বের এই পরিবর্তন বিএনপির সাংগঠনিক ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বিশ্লেষকদের চোখে বিএনপির ৪৮ বছর
বিএনপির ৪৮ বছরের পথচলা, আদর্শ, সংগঠন এবং নতুন নেতৃত্ব—এই বিষয়গুলো নিয়ে দলের দুই নেতা ও একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মূল্যায়নে ভিন্ন ভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর মতে, দলের সামনে এখন সংগঠন শক্তিশালী রাখা এবং নেতা-কর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করাই বড় কাজ।
তিনি বলেন, ‘চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই। প্রতি পদে পদে এটিকে মোকাবিলা করে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়াটাই প্রধান কাজ। অনেক সংকট থাকবে, অনেক সমস্যা থাকবে। সেগুলো নিরসন করে করে আমাদের সামনের দিকে এগোতে হবে।’
তারেক রহমানকে দলের প্রেরণার উৎস উল্লেখ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘তার বাবা ও মায়ের যে অসমাপ্ত কাজ, সেই কাজগুলো তিনি পূর্ণতা দিচ্ছেন এবং পূর্ণতা দান করবেন।’
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব’—এই তিন প্রত্যয়ের সঙ্গে দল কখনো আপস করেনি।
বিএনপির কাউন্সিল শিগগির, মহাসচিব পদে আলোচনায় যারা
নেতা-কর্মীদের অনৈতিক প্রলোভন থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে রিজভী বলেন, ‘নিজের মনকে আলোকিত রাখবে। নিজের মনকে স্বচ্ছ রাখবে।’
সাংগঠনিক কার্যক্রম প্রসঙ্গে রিজভী জানান, জাতীয় কাউন্সিলের আগে অসম্পূর্ণ জেলা, থানা ও ইউনিট পর্যায়ের কাউন্সিল শেষ করার চেষ্টা থাকবে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের মতে, প্রতিষ্ঠার সময় বিএনপি যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, দলটি এখনো তা থেকে বিচ্যুত হয়নি।
তিনি বলেন, ‘এই দেশে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, মানুষের ভোটাধিকার, অর্থনৈতিক উন্নতি এবং বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে একটা আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা—এগুলোই ছিল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।’
পররাষ্ট্রনীতিতে দেশের স্বার্থ ও সম্মানকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও অর্থনীতিসহ নীতিনির্ধারণে মানুষের রায়ের প্রতিফলন থাকা উচিত বলেও মনে করেন।
তারেক রহমানের তৃণমূলভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে আলাল বলেন, ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং তারেক রহমানের ২৭ দফা, যা পরে ৩১ দফায় রূপ নেয়—এসবের মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ধারাবাহিকতা রয়েছে।
বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যারা ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা এখানে চালু করে রেখে গিয়েছিল, তাদের কিন্তু কিছু কিছু অনুচর এখনো বিভিন্ন জায়গায় ঘাপটি মেরে আছে।’
তরুণ ও যুবকদের মধ্য থেকে নতুন নেতৃত্ব তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আলাল বলেন, ‘মানুষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত বিএনপি পথ হারিয়েছে—এই কথাটা এখন পর্যন্ত আসেনি।’
তৃণমূলে জনসমর্থন যাচাইয়ে বড় পরীক্ষার সামনে বিএনপি
হাতে স্টিয়ারিং, কাঁধে নিজের ব্যাগ, কী বার্তা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারীর মতে, রাজনৈতিক দলের ভালো ও খারাপ সময় থাকেই। সেই চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার নীতিতে এগিয়ে গেলে বর্তমান সরকার ভালো করবে।’
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে জিয়া ও খালেদা জিয়ার নীতিকে সামনে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বৈদেশিক নীতি প্রসঙ্গে অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারীর মন্তব্য, ‘বৈদেশিক নীতিতে সরকার জিয়াউর রহমানের নীতি অনুসরণ করছে—এটা আমার কাছে মনে হয় সঠিক আছে।’
তবে দলীয় শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের স্বচ্ছতার ওপরও গুরুত্ব দেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
কী পেল, কী হারাল বিএনপি?
৪৮ বছরে বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, বড় নির্বাচনি ম্যান্ডেট পেয়েছে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থায়ী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে দলটিকে ক্ষমতা হারানো, নেতৃত্বের সংকট, সাংগঠনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক সংঘাত এবং দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকার অভিজ্ঞতাও অর্জন করতে হয়েছে।
তবে বড় ধাক্কা সত্ত্বেও বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্র থেকে হারিয়ে যায়নি। ক্ষমতায় ফেরা এবং বিরোধী রাজনীতিতে ফিরে যাওয়া—দুই অভিজ্ঞতাই দলটির রাজনৈতিক চরিত্র গঠনে ভূমিকা রেখেছে।
সত্যের মুখোশে মিথ্যা, বিএনপিকে নিয়ে অপপ্রচারের বিস্তার সামনে নতুন পরীক্ষা
৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির সামনে তাই পুরোনো প্রশ্ন নেই—কীভাবে ক্ষমতায় ফেরা যায়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে সেই প্রশ্নের উত্তর দল দিয়েছে।
এখন বড় প্রশ্ন—ক্ষমতায় থেকে বিএনপি কীভাবে সংগঠন, আদর্শ ও জনভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে?
দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতিতে আন্দোলনকে ঘিরে যে সাংগঠনিক শক্তি তৈরি হয়েছিল, এখন রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি তা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। সরকার ও দলের মধ্যে সমন্বয়, তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ, দলীয় শৃঙ্খলা এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরি—এসবই সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জাতীয় কাউন্সিলের আগে অসম্পূর্ণ জেলা, থানা ও ইউনিট পর্যায়ের কাউন্সিল শেষ করার কাজও রয়েছে।
বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস তাই শুধু ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতা হারানোর গল্প নয়। এটি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলের উত্থান, তার মৃত্যুর পর নেতৃত্বের পরিবর্তন, এরশাদবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯১ সালের ক্ষমতায় ফেরা, ১৯৯৬ সালের সংকট, ২০০১ সালের প্রত্যাবর্তন, ওয়ান-ইলেভেনের ধাক্কা এবং দীর্ঘ দুই দশকের বিরোধী রাজনীতির ইতিহাস। সবশেষে এসেছে ২০২৬ সালের প্রত্যাবর্তন—সঙ্গে এসেছে নেতৃত্বের প্রজন্মান্তরের পরিবর্তন। এবার বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ ক্ষমতায় ফেরা নয়; ক্ষমতায় থেকে ৪৮ বছরের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের উপযোগী করে তোলা। সেখানেই নির্ধারিত হবে বিএনপির পরবর্তী ৪৮ বছরের রাজনীতির ভিত্তি।
এমকন্ঠ/এস