নারী নেতৃত্ব সংকটের আশংকায় বেরোবি কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ

পারভেজ হাসান, বেরোবি
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি), রংপুরের অনুষ্ঠিতব্য কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন (ব্রাকসু) ঘিরে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে সম্ভাব্য নারী নেতৃত্বের সংকট। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠনের নেত্রী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নারীরা এখনও অনেক পিছিয়ে। যা ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী সংসদ পরিচালনায় সমতা ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হওয়া সত্ত্বেও রাজনীতির অঙ্গনে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। এমনই অভিযোগ ছাত্র-ছাত্রীদের একটি বড় অংশের। তারা বলছেন, ব্রাকসু কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল করতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক শিক্ষার্থীই রাজনৈতিক অঙ্গনের জটিলতা, মতামত প্রদানে অনীহা, নিরাপত্তা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সামনে আসতে দ্বিধাবোধ করেন। ফলে প্যানেল গঠন থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রচারণা সব জায়গায় নারী নেতৃত্বের ঘাটতি থেকেই যায়।

আসন্ন নির্বাচনে নারী নেতৃত্বের সংকট প্রসঙ্গে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী সেঁজুতি দাস মুমু বলেন, “বেরোবিতে নারী নেতৃত্ব তৈরি করার পরিবেশের যথেষ্ট অভাব আছে। এখানে নেতৃত্ব বিকাশেরই সুযোগ নেই, নারী নেতৃত্ব তো দুরের কথা। নারী নেতৃত্ব তৈরি করতে নিরাপত্তা প্রয়োজন৷ উত্তরবঙ্গের মানুষ ভীরু প্রকৃতির। মেয়েদের নেতৃত্বে আসার প্রথম সংকট নিরাপত্তার।”

তিনি আরো বলেন, “বেরোবিতে অনুষ্ঠানের নামে প্রাইমারি স্কুলের খেলাধুলা হয়। এতে নেতৃত্ব গঠন হবে কিভাবে! শিক্ষার্থীরা আওয়াজ তুললেই তাদের দাবিয়ে দেয়া হয়৷ রেজাল্টের ক্ষমতা শিক্ষকদের হাতে। ছেলেরা এগুলো তোয়াক্কা না করলেও। অনেক মেয়েই ভয় পায়৷ এতদুরে বাবা মা পাঠিয়েছে রেজাল্ট খারাপ করলে কি হবে। মুলত পারিবারিক অবস্থানও একটি বড় বিষয়। আমাদের ছোট ইউনিভার্সিটি। এখানে এমনি সুযোগ কম, তার উপর পারিবারিক দিক থেকেও এলাও করে না।”

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব রাশেদ মন্ডল বলেন, “গনতান্ত্রিক অধিকার চর্চায় নিরুৎসাহিত করা যখন প্রশাসনের মুল এজেন্ডা হয়, তখন নারী শিক্ষার্থীরা আদর্শ ধারণ করে নীরবে কাজ করে যায়। বিভিন্ন মতাদর্শ চর্চার ক্ষেত্র হচ্ছে ছাত্রসংসদ। শিক্ষার্থীদের অধিকার চর্চা করতে গিয়ে ছাত্রত্ব হরণের প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নারী শিক্ষার্থীদের রাজনীতি সচেতন হওয়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত বাধা।”

তিনি আরো বলেন, ” নারীর রাজনৈতিক আদর্শ চর্চার ক্ষেত্র যখন উন্মুক্ত থাকবে, যখন ট্যাগিং করা হবে না, বাকাঁ চোখে দেখা হবে না, তখন নারী আপন মহিমায় মহিমান্বিত হবে। যে মতাদর্শই ধারণ করুক, নারীকে উপরোক্ত বিষয় গুলো থেকে বিরত রাখতে পারলে, ইনশা আল্লাহ নারী প্রকৃত নেতৃত্ব দিতে পারবে।”

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রাহাতুল জান্নাত বলেন, “আমরা যদি নারী নেতৃত্বের সংকট নিয়ে আলোচনা করি, অনেকেই বলবেন ‘নারীরা তো নিজেরাই আসে না।’ কিন্তু বিষয়টা এত সরল নয়। আমাদের ভাবতে হবে, নারীরা কেনো আসে না, কী বাধাগুলো তাদের পথ রুদ্ধ করে। ন্যায্যতার জায়গা থেকে বলতে গেলে, নারীদের সামনে সেই সুযোগ ও সহায়ক পরিবেশটি আগে তৈরি করতে হবে। নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা নারীদের নেই—এমন ভাবা একেবারেই ভুল। বরং সেই ক্ষমতা আছে, তবে সেই সুযোগের দরজা এখনো সবার জন্য সমানভাবে খোলা নয়। তাই নারী নেতৃত্বের এই অনুপস্থিতি শুধু প্রতিনিধি সংকট নয়, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করবে।”

একই বিভাগের শিক্ষার্থী মীম বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী নেতৃত্ব অনুশীলনের অভাব। যেহেতু পূর্ববর্তী সময়ে এর অনুশীলন ছিল না তাই কেউ অনুপ্রাণিত হয় নি। নারী নেতৃত্বের এই সংকটের কারণে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে নারী প্রতিনিধির সংকট দেখা দিতে পারে। যা ভবিষ্যতে নারীর অধিকার আদায়ে অন্যতম অন্তরায়।”

সমাজে নারী নেতৃত্বের চর্চা যত বাড়বে, ততই দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে। আর সেই পরিবর্তন শুরু হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। তাই ব্রাকসুর এই নির্বাচনকে অনেকেই দেখছেন নারী নেতৃত্বকে শক্ত ভিত্তি দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে।

আগামী দিনের ব্রাকসু কি নারী নেতৃত্বের নতুন অধ্যায় রচনা করবে, নাকি আগের মতোই পেছনে থেকে যাবে নারী কণ্ঠ? সেই উত্তরের অপেক্ষায় পুরো ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীরা আশাবাদী, পরিবর্তনের এই যাত্রায় নারীরা হবেন ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক।

এমকন্ঠ/পারভেজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *