1. mithapukur24barta@gmail.com : Mithapukur : Mithapukur
  2. admin@mithapukurerkantho.com : মিঠাপুকুরের কন্ঠ :
সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:১০ পূর্বাহ্ন

তেঁতুলিয়ার প্রান্তে দাঁড়িয়ে দেখা স্বপ্নের চুঁড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা

  • প্রকাশিত : রবিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৯১ বার পাঠ করা হয়েছে
-ছবি সংগ্রহীত

ডেস্ক রিপোর্ট:
শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর। ঠান্ডা হাওয়া, ঘাসের বুকে শিশির আর আকাশে সূর্যোদয়ের মৃদু গোলাপি আলো। বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেসের রাতের ট্রেনে যখন পঞ্চগড় পৌঁছালাম, তখনও সূর্য পুরোপুরি ওঠেনি।

ট্রেন থেকে নেমে চা-বাগানের পাশ দিয়ে তেঁতুলিয়ার দিকে চললাম। বাংলাদেশের উত্তর প্রান্তের ছোট শহর তেঁতুলিয়া, যেখানে দাঁড়িয়ে দেখা যায় বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। এই পাহাড়ের দেখা পাওয়া মানে যেন উপমাহীন এক নীরব সৌন্দর্য আর বিস্ময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নির্বাক হয়ে যাওয়া।

তেঁতুলিয়ার পথে যতই অগ্রসর হচ্ছি, চারপাশের দৃশ্যও ততই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছিল। দুচোখের সীমারেখায় সবুজ চা-বাগান আর দূরের নীলচে পাহাড়ের রেখা সব মিলিয়ে শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক অনন্য ছবি। স্থানীয় একজন বললেন, “আজ আকাশ পরিষ্কার, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা মিলবেই।” তখন মনটা আনন্দে ভরে গেল।

সকাল সাতটার দিকে পৌঁছালাম তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা সীমান্তের কাছে। এখানেই আছে বিখ্যাত তেঁতুলিয়া ভিউ পয়েন্ট, যেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা সবচেয়ে পরিষ্কার দেখা যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হলো আমি বাংলাদেশের একেবারে শেষ প্রান্তে, আমার চোখের সামনে ছড়িয়ে আছে নেপাল, ভারত আর তিব্বতের পাহাড়ি দিগন্ত।

হঠাৎ দূর আকাশের কোলে দেখা দিল একগুচ্ছ সাদা আলো। প্রথমে মনে হলো মেঘ, কিন্তু একটু পরেই বুঝলাম এটিই কাঞ্চনজঙ্ঘা। সূর্যের প্রথম আলো পড়তেই বরফে ঢাকা পাহাড়গুলো সোনালি রঙে ঝলমল করে উঠল। দৃশ্যটা এত সুন্দর ছিল যে সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। কেউ ছবি তুলছে, কেউ চুপচাপ তাকিয়ে আছে, আর আমি শুধু স্থির হয়ে সেই অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম। এমন দৃশ্য হয়তো জীবনে খুব কমই চোখে পড়ে।

হালকা বাতাস বইছে, সাথে আসছে চায়ের মিষ্টি ঘ্রাণ আর শীতের কুয়াশা। দূরে ছোট ছোট গ্রাম, মাঠে কৃষকের কাজ, আর আকাশের কোলে সেই সাদা পাহাড়। সব মিলিয়ে যেন এক স্বপ্নের দৃশ্য। মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে পুরো হিমালয়কে ছুঁয়ে ফেলছি।

তেঁতুলিয়ার মানুষ খুব অতিথিপরায়ণ। এক দোকানে বসে চা খেতে খেতে দোকানদার বললেন, “ভাই, কাঞ্চনজঙ্ঘা আমাদের গর্ব। কুয়াশার জন্য প্রতিদিন দেখা যায় না কিন্তু যখন দেখা দেয়, মনে হয় আল্লাহর এক অনন্য সৃষ্টি দেখছি।”

তার কথা শুনে মনে হলো, সত্যিই কাঞ্চনজঙ্ঘা শুধু একটা পাহাড় নয়। এটা এক অনন্য অনুভূতি, প্রকৃতি আর মানুষের এক মধুর সম্পর্কের প্রতীক।

বাংলাদেশের উত্তরের শেষ জেলা পঞ্চগড়। হিমালয় কণ্যা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা হতে কাঞ্চনজঙ্ঘার দুরত্ব মাত্র ১১ কি.মি.। বাংলাবান্ধা হতে নেপালের দূরত্ব ৬১ কি.মি, এভারেষ্ট চূড়া ৭৫ কি.মি, ভূটান ৬৪ কি.মি, চীন ২০০ কি.মি, ভারতের দারজিলিং ৫৪ কি.মি, ভারতের শিলিগুড়ী ৮ কি.মি, ভারতের কাঞ্চনজঙ্ঘা ১০ কি.মি। যা নেপাল, ভারত ও ভুটানের সীমান্ত জুড়ে বিস্তৃত। এর উচ্চতা প্রায় ৮,৫৮৬ মিটার (২৮,১৬৯ ফুট)। এটি পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত।

শীতের মৌসুমে বিশেষ করে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত আকাশ পরিষ্কার থাকলে তেঁতুলিয়া ভিউপয়েন্ট থেকেই স্পষ্টভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। তাই এই সময়ই ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।

এখন পঞ্চগড়ে গড়ে উঠেছে অনেক চা বাগান। এখানে পাহাড় না থাকলেও এই চা-বাগানগুলো সবুজ গালিচার মতো ছড়িয়ে আছে মাঠের পর মাঠ। সেই চা-বাগানের মধ্য দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য দেখলে মনে হয় বাংলাদেশ আর হিমালয় যেন এক অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে গেছে।

বিকেলের আলো ঢলে পড়ছে। কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফঢাকা চূড়াগুলো তখন সোনালি থেকে কমলা, তারপর গোলাপি রঙে রঙিন হচ্ছে। সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে পর্বতের উপর নরম আলো ছড়িয়ে পড়ল। দেখে মনে হচ্ছিল যেন প্রকৃতি নিজের হাতে তুলির আঁচড়ে আকাশ রাঙিয়ে দিয়েছে।

ট্রেনে ফেরার সময় জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি, দূরের পাহাড়ের ছায়া ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে কুয়াশায়। কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন নীরবে বিদায় জানাচ্ছে। সেই সোনালি ভোর, তেঁতুলিয়ার চায়ের ঘ্রাণ আর পাহাড়ের নিস্তব্ধতা আজও মনে গেঁথে আছে।

ঢাকা থেকে সরাসরি তেঁতুলিয়া যাওয়ার জন্য বাস অথবা ট্রেন দুটোই সুবিধাজনক। বাসে গেলে জনপ্রতি ১১০০-১৯০০ এবং ট্রেনে ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস বা দ্রুতযান এক্সপ্রেসে ৭৫০-২৫০০ টাকা পর্যন্ত লাগে।

পঞ্চগড় শহরে রাতে থাকার জন্য হোটেল মৌচাক, হোটেল রাজনগর, হোটেল প্রীতম এবং হোটেল ইসলাম উল্লেখযোগ্য। তেঁতুলিয়ায় রাত্রিযাপনের জন্য চা বাগানের মাঝে অসংখ্য সুন্দর সুন্দর রিসোর্ট রয়েছে। এদের মধ্যে ডাহুক টি রিসোর্ট অন্যতম।

তেঁতুলিয়ার বিখ্যাত স্থানীয় খাবারের মধ্যে রয়েছে সিদল, পেলকা এবং ছেকা। এখানকার কাঁচা পাতার চাও বেশ জনপ্রিয়, যা তেঁতুলিয়ার চা বাগান থেকে আসে। এছাড়াও তেঁতুলিয়া উপজেলায় সাধারণ নাস্তা ও খাবারের জন্য বাঙালি হোটেল রয়েছে। এছাড়াও পঞ্চগড় শহরে হোটেল করোটিয়া, হোটেল মৌচাক,হোটেল নিরিবিলি, হোটেল এইচ কে প্যালেস, হোটেল হামজাসহ স্বল্পমূল্যের উন্নতমানের খাবারের হোটেল রয়েছে।

পঞ্চগড়ের এই সফর শুধু একটা ভ্রমণ নয় এটা এক অনুভব, যেখানে আকাশ, মাটি আর হৃদয় এক হয়ে যায়।

মো: পারভেজ হাসান
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
© All rights reserved © mithapukurerkantho.com