মিঠাপুকুরে যাত্রীসেজে ভ্যানচালককে হত্যা, তদন্তে গড়িমশির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার একডালা গ্রামের মনতাজ আলী (৬৫) পেশায় একজন ভ্যানচালক ছিলেন। ঘটনার দিন স্থানীয় বাজারে তিনি ভ্যান নিয়ে ভাড়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেদিন তার ভ্যান ভাড়া করা হলেও ভাড়া শেষে তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। কারণ তার ভ্যানে যাত্রীসেজে উঠেছিলেন হত্যাকারীরা। তারা সুযোগ বুঝে ভ্যানচালক মনতাজ আলীকে নির্মমভাবে হত্যা করে মৃতদেহ ফেলে রাখে রাস্তার পাশে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় থানায় মামলা করেন নিহত মনতাজ আলীর ছেলে ফারুক মিয়া।

বাদীর অভিযোগ ঘটনার প্রায় দেড় বছর অতিবাহিত হলেও মামলার তদন্তে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি হয়নি। মূল অপরাধীরা এখনো অধরা থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন নিহতের পরিবার ও স্থানীয় এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার চরম গড়িমশি এবং উদাসীনতার কারণেই হত্যার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না। ধরাছোয়ার বাইরে থাকছে অপরাধের সাথে জড়িতরা।

নিহত ভ্যান চালক মনতাজ আলী (৬৫) মিঠাপুকুর উপজেলার বড়বালা ইউনিয়নের একডালা গ্রামের বাসিন্দা এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। ঘটনার দিন ৩০/০৮/২০২৪ ইং রাত ৯টার দিকে জীবিকার তাগিদে ভ্যান নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি তিনি। পরেরদিন সকালে পার্শ্ববর্তী পীরগঞ্জ থানার চৈত্যকল ইউনিয়নের দানিশনগর এলাকার একটি কাচা রাস্তার পাশ থেকে তার পড়ে থাকা রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

মামলার অভিযোগপত্র ও নিহতের পরিবার সুত্রে জানা গেছে, হত্যাকারী চক্রের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে যাত্রী সেজে তার ভ্যানে ওঠে। পরবর্তীতে নির্জন স্থানে গিয়ে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং ভ্যানটিও নিয়ে যায়। পরের দিন সকালে ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় নিহতের পরিবার জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হত্যাকান্ডটি পরিকল্পিত দাবি করে মিঠাপুকুর উপজেলার একডালা গ্রামের মৃত মিয়া উদ্দিনের ছেলে মনছুর রহমান (৭০) ও মনছুর আলীর ছেলে মিজানুর রহমান (৪৫) সহ অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় জাকির নামে একজনকে পুলিশ আটক করলেও বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন।

মামলার বাদীর অভিযোগ, ঘটনার সাথে সুমন মিয়া ও জাকির হোসেন নামে আরও ২জন জড়িত থাকলেও বিষয়টি গুরত্ব দিচ্ছেন না তদন্তকারী কর্মকর্তা। নানান টালবাহানায় সময় পার করছেন। ঘটনার প্রায় দেড় বছর অতিবাহিত হলেও তদন্ত প্রক্রিয়া কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ মামলার বাদীর। নিহতের পরিবারের দাবি, ঘটনার পর পুলিশকে সিসিটিভি ফুটেজসহ সম্ভাব্য কিছু সন্দেহভাজন ও ক্লু দেওয়া হলেও অজ্ঞাত কারণে পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্তের আওতাভুক্ত করেনি।

নিহতের স্ত্রী মারুফা বেগম কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, হামার স্বামীক মারি ফেলাইলো। হামরা গরিব মানুষ ,পুলিশ হামার মামলা ঠিকমতো দেখোছে না? থানাত যাই খালি কয় তদন্ত হওছে। খুনিরা প্রকাশ্যে ঘুরি বেড়াওছে আর হামরা আতঙ্কোত দিন কাটাওছি। হামরা মনে হয় বিচার পাবা নাই।

মামলার বাদী ও নিহতের ছেলে ফারুক মিয়া বলেন, আমার বাবাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমাকেও হত্যা করার জন্য লোক ভাড়া করা হয়েছিল কিন্তু আমাকে মারতে পারে নাই। ওরা আমার বাবাকে হত্যা করেছে। ঘটনার শুরু থেকেই তদন্ত নিয়ে আমাদের অভিযোগ ছিল। কারণ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্যসমূহ জড়িতদের চিহ্নিত করলেও পুলিশ অদৃশ্য কারণে তাদেরকে বাদ দিয়ে তদন্ত রিপোর্ট দিচ্ছে। এমনকি সিআইডিও শুরুতে তদন্তের অগ্রগতি দেখালেও পরে আর গুরুত্ব নেই। আমার বাবাকে মাত্র একজন হত্যা করে নাই। আরও লোক জড়িত আছে কিন্তু নিরপেক্ষ তদন্ত হচ্ছে না।

এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হাসান বলেন, এ ঘটনায় এখনো তদন্ত চলমান রয়েছে। যদি কারও ঘটনার সাথে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদেকে ভ্যানচালিয়ে জীবিকানির্বাহ করা একজন শ্রমজীবি মানুষকে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। ভুক্তভোগী পরিবারটির একটাই দাবি—তদন্তের নামে যেন আর সময়ক্ষেপণ করা না হয়। অনতিবিলম্বে প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো ভ্যানচালককে এভাবে জীবন দিতে না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *