রংপুরে চার খুন, এজাহার থেকে আলামত অসংগতি ও প্রশ্নের কঠিন সমীকরণ, তদন্তে ডিবি

আমিরুল কবির সুজন,স্টাফ রিপোর্টার:

#এজাহারে কী আছে জানেন না বাদী , সময় নিয়েও প্রশ্ন।
#বাড়ির বিদ্যুৎ-সংযোগ কেন বিচ্ছিন্ন ছিল বড় প্রশ্ন?
#ধর্ষণের আলামত মেলেনি, ডোমের বক্তব্য ঠিক নয়।
#তদন্তের ভার ডিবিতে।
# সব প্রশ্নের জবাব খুঁজে বের করাই আমাদের দায়িত্ব বললেন নবাগত পুলিশ কমিশনার
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনা দেশ ও বিদেশে আলোচিত হয়েছে। এই হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনসহ চারটি তরতাজা জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ার পিছনের কারণ কি? এই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। তদন্তে সামনে আসছে কিছু প্রশ্ন ও অসংগতি। এ কারণে হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনে ধোয়াশা কাটছেই না। শুরুতেই মাদক সেবন দেখে ফেলার কারণে নৃশংস এই হত্যাকান্ড ধারণা করা হলেও আসামীদের ডোপ টেস্টে নেগেটিভ আসায় আবারো আরোচনার তৈরি হয়েছে। একের পর এক সামনে আসা নতুন নতুন তথ্যে সন্দেহ বাড়ছেই। ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত এবং ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে নানা প্রশ্নের মুখে উত্তর যেন ব্রাকেটবন্দি। এমন কঠিন সমীকরণ আর প্রশ্নের মধ্যেই মামলার তদন্ত থানা-পুলিশের কাছ থেকে পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) শাখায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ একটাই প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানতে চান তা হলো এই হত্যার কারণ কি? অবশ্য নবাগত পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রশীদ বলেছেন, এই ঘটনা এবং মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তের চলমান ধারাবাহিকতায় অনেক প্রশ্নও আসবে, সে প্রশ্নগুলোর পেশাদারিত্বের সাথে জবাব খুঁজে বের করাই আমাদের দায়িত্ব। আমরা সেই কাজগুলো করছি।

আলোচিত এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ। তবে নিহত পরিবারের স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা, সচেতন নাগরিক ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে অধিকতর তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ হচ্ছে। ঘটনার পেছনে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করার দাবি উঠেছে।

এদিকে হত্যার প্রকৃত কারণ নিশ্চিতে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। ঘটনার শুরুতে মাদকের বিষয়টি সামনে আসে কিন্তু পরে পুলিশ ধারণা করেন হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু ইয়াবা সেবন বা তা দেখে ফেলা নয়, বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, জমি-সংক্রান্ত বঞ্চনার বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাস্তবে এই হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের তথ্য, বাদীর বক্তব্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় হত্যার প্রকৃত কারণ নিয়ে প্রশ্নের যোগসুত্র এবং অসংগতি বেড়েই চলছে। অসংগতি আর প্রশ্নের মধ্যেই মামলার এজাহারে সময় নিয়ে গরমিল, স্বর্ণ উদ্ধারের স্থান, মরদেহ উদ্ধারের সময় রাতে বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা, ময়নাতদন্তের কাজে নিয়োজিত ডোম তার ভাষ্যে ধর্ষণের ইঙ্গিত, ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ও ফরেনসিক ল্যাবের প্রতিবেদন বলছে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। এমন নিত্যনতুন বিষয়গুলো সামনে আসায় তদন্ত নিয়ে নিরপেক্ষতার প্রশ্ন ও নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। এসব প্রশ্ন আর রহস্যের মধ্যেই পুলিশের ধারণা হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু ইয়াবা সেবন বা তা দেখে ফেলার ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, জমি-সংক্রান্ত বঞ্চনার বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে। এমন প্রশ্ন আর সন্ধেহের মধ্য দিয়ে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এজাহার থেকে আলামত কিছু অসংগতি ও প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। এমন কঠিন সমীকরণের উত্তর খুজতে কাজ করছে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।

এজাহার নিয়ে বাদীর দাবি ও প্রশ্ন
মামলার এজাহারে কী লেখা আছে, তা জানেন না বলে দাবি করেছেন মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘মামলা পুলিশেরা লিখছে, থানায়। লেখার পর সই নিছে। পড়ে দেখি নাই। লেখার সময় বসে ছিলাম। লেখা শেষে বলল, বাবু এখানে সই দাও।’ রোববার বেলা আড়াইটা থেকে তিনটার দিকে এজাহারে স্বাক্ষর করেছিলেন বলে জানান গোপীনাথ চক্রবর্তী। অথচ এজাহারে সময় লেখা আছে সকাল ১০টা ৩০ মিনিট। মহানগর পুলিশ কমিশনার সংবাদ সম্মেলন করে হত্যারহস্য উদ্ঘাটন এবং দুজনকে আটকের কথা জানান রোববার বেলা পৌনে ১টার দিকে। এজাহারে বাদীর স্বাক্ষরের আগেই পুলিশ হত্যারহস্য উদ্ঘাটন এবং দুজনকে আটকের কথা বললেও এজাহারে আটক দুজনের নাম নেই। এ বিষয়ে মামলার বাদী বলেন, ‘গ্রেপ্তার দুজনের নাম এজাহারে নেই কেন, সেটা পুলিশ ভালো জানে।’

এজাহারে অসংগতির বিষয়ে জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের বলেন, ‘আমি কাগজ-কলমে যখন পেয়েছি, সেটাই দিছি, মামলা নিয়ে অসংগতির কী আছে। সাড়ে ১০টায় এজাহার প্রাপ্তি সাপেক্ষে লেখায় আছে। বাদী কী বলে? কাগজে কলমে তো সাড়ে ১০টাই আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আর স্যারেরা সংবাদ সম্মেলন করে যেটা বলেছে, সেটাই। এর বেশি কিছু আমরা বলতে পারব না।’

হত্যায় শুধু দুজন জড়িত এবং ইয়াবা সেবনে বাধা পাওয়ায় তাঁরা হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে পুলিশ যে বক্তব্য দিয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন না বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘পুলিশের এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। এর পেছনে বড় কোনো চক্র আছে। পুলিশ যদি বলে, এই দুজনে জড়িত আর কেউ নয়; তাহলে কার বিচার কে করবে। ওইটা যদি পুলিশের শেষ কথা হয়, তাহলে বিচার কীভাবে সুষ্ঠু হবে। ডিবি, সিআইডি, পিআইবি—তাহলে এরা কী করে।’

রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ বলেন, ‘প্রতিটি মামলার এজাহার অভিযোগকারীর কথা অনুযায়ী লিখিত হওয়ার কথা। এ ক্ষেত্রে অভিযোগকারী জানেই না, সেখানে কী লেখা আছে। এজাহারের বক্তব্য, ঘটনাস্থলসহ পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। কাজেই সার্বিকভাবে অনেক প্রশ্ন সামনে আসছে। তাই এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন।’

বিদ্যুৎ-সংযোগ কেন বিচ্ছিন্ন, কারা করেছিল
লাশ উদ্ধারের রাতে পুরো বাড়ি বিদ্যুৎবিহীন ছিল বলে জানান স্বজন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। গণপতির বাড়ি থেকে ৫০ মিটার দূরে রাস্তার ধারে মন্দিরের প্রাচীরের মধ্যে থাকা বিদ্যুতের খুঁটি থেকেই সংযোগটি বিচ্ছিন্ন ছিল। লাশ উদ্ধারের সময় মিস্ত্রি ডেকে সংযোগ ঠিক করা হয়। সেই রাতে বিদ্যুৎ-সংযোগ ঠিক করার কাজটি করেছিলেন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি উজ্জ্বল বর্মন। তিনি বলেন, ‘রাত ১টার দিকে আমাকে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে গিয়ে দেখি, বৈদ্যুতিক পিলারে মেইন তার থেকে মিটারের তার সম্পূর্ণ আলাদা। সংযোগটি ৩০ ফুট উঁচুতে ছিল। সম্ভবত বাঁশের গুঁতা দিয়ে বা টেনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।’

মামলার বাদী বলেন, ‘বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে কাজ (হত্যা) করা হইছে। বিদ্যুৎ বন্ধ করল কারা? এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। নিশ্চয় আরও লোক ছিল। কেউ নিচে কাজ করছে, কেউ ওপরে কাজ করছে। দুজন ছেলেমানুষের পক্ষে চারজনকে খুন করা সম্ভব না।’

আটক ও আলামত উদ্ধার নিয়ে অসংগতি, প্রশ্ন
লাশ উদ্ধারের রাতে ৩টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে তিনজনকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। তাঁদের মধ্যে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে রেখে আটক পলাশ দাস নামে অপরজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে পরিবারের সঙ্গে পলাশ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। পরদিন পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে দাবি করে, হত্যার পর স্বর্ণালংকার লুট করে মাছুয়াপাড়া মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় রেখেছিলেন খুনিরা। পুলিশ সেখান থেকে উদ্ধার করে।

স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনার সাক্ষী দুলাল শর্মা। তিনি বলেন, ‘স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনাটির বর্ণনা আর পুলিশ যেখান থেকে উদ্ধার করেছে, তার মিল নেই। এটা সাজানো হতে পারে। নাটকের মতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘বেলা ১১টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখে আমার মনে হয়েছে, কয়েক ঘণ্টা আগে খুঁড়ে পুঁতে রাখা। মাটি আলগা ছিল।’

পুলিশের বক্তব্য ডোমের ভিডিও, চিকিৎসক যা বললেন
চারজনের লাশের ময়নাতদন্তের কাজে নিয়োজিত ডোম যতন রায়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। লাশ উদ্ধারের ঘটনা উল্লেখ করে ভিডিওতে তিনি ইঙ্গিত দেন, গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও মেয়েকে সম্ভবত হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রংপুর মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাবুল কুমার বিশ্বাস বলেছেন, নমুনা সংগ্রহ করে ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছিল। প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি।

সার্বিক বিষয়ে ডিবির উপকমিশনার সনাতন জানান, দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালত সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আসামিদের বক্তব্য পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে মিল রয়েছে।

নবাগত পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রশীদ শুক্রবার (২৮ আগস্ট) হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, আমি এখানে ঘটনাস্থল দেখতে এসেছি। এই ঘটনা এবং মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তের চলমান ধারাবাহিকতায় অনেক প্রশ্নও আসবে, সে প্রশ্নগুলোর পেশাদারিত্বের সাথে জবাব খুঁজে বের করাই আমাদের দায়িত্ব। আমরা সেই কাজগুলো করছি।

তিনি আরও বলেন, চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এই মামলা নিয়ে সারাদেশে নানান রকম কথাবার্তা হচ্ছে। প্রতিটি কথাবার্তার সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ করে যথাযথ জবাবদিহির মাধ্যমে মামলাটিকে সঠিক পর্যায়ে নিয়ে আদালতে চার্জশিট দাখিল করাই আমাদের লক্ষ্য। যাতে সুবিচার নিশ্চিত হয়।

 

এমকন্ঠ/এস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *